মুঞ্জুরুল হক মুঞ্জু, পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. ফারজানা জামান পুণমের বদলির খবরে সাধারণ রোগী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে থেকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসা এই চিকিৎসককে হঠাৎ বদলির সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের সংকট দীর্ঘদিনের। এমন পরিস্থিতিতে ডা. ফারজানা জামান পুণম রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা, মানবিক আচরণ এবং সাধ্যের মধ্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন।
অভিযোগ বা প্রশ্ন উঠছে—তাঁর অপরাধটা কী?
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, তিনি গরিব ও অসহায় রোগীদের সর্বোচ্চ সহায়তা দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। রোগীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের অনেক সময় বিনামূল্যেও চিকিৎসা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর কাছে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিরা।
এছাড়া পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সিজারিয়ান সেবার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি—যাতে এলাকার মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে কিশোরগঞ্জে গিয়ে চিকিৎসা নিতে না হয়। হাসপাতাল কেন্দ্রিক কোনো দালাল চক্রকে প্রশ্রয় না দেওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় ওষুধ না লেখার বিষয়টিও স্থানীয়দের আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় রোগীদের আরও দাবি, যেখানে বেসরকারিভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে অনেক ক্ষেত্রে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে ডা. পুণম তুলনামূলকভাবে স্বল্প খরচে—প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে—রোগী দেখতেন। এমনকি হাসপাতালের অন্য চিকিৎসক না থাকলেও প্রয়োজনের সময় তাঁকে পাওয়া যেত বলে জানিয়েছেন অনেকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডা. ফারজানা জামান পুণম পাকুন্দিয়ারই সন্তান। স্থানীয়দের ভাষ্য, নিজের এলাকার মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন থেকেই তিনি চিকিৎসা পেশায় এসেছেন এবং সুযোগ পেলেই এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ফলে তাঁর বদলির খবরে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্র রোগীদের স্বল্প খরচে চিকিৎসা দেওয়া এবং চিকিৎসাসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা যদি অপরাধ না হয়, তাহলে হঠাৎ তাঁর বদলির প্রয়োজন হলো কেন?
স্থানীয়দের কেউ কেউ আরও জানতে চাইছেন, কাদের প্ররোচনা বা সুপারিশে এই বদলি হয়েছে? তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্বচ্ছভাবে বদলির কারণ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেখানে চিকিৎসক সংকট রয়েছে, সেখানে অভিজ্ঞ ও রোগীবান্ধব একজন চিকিৎসককে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবায় কী প্রভাব ফেলবে—সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
তাঁদের দাবি, ডা. ফারজানা জামান পুণমের বদলির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে তাঁকে পাকুন্দিয়ায় রাখার ব্যবস্থা করা হোক। একই সঙ্গে বদলির পেছনে কোনো প্রশাসনিক, পেশাগত বা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে তা জনসম্মুখে পরিষ্কার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মানুষের ভালোবাসা ও আস্থা একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় অর্জন। আর সেই আস্থার কারণ যদি হয় মানবিকতা, আন্তরিকতা ও সেবার মানসিকতা—তাহলে এমন একজন চিকিৎসককে ধরে রাখার বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
পাকুন্দিয়ার মানুষের প্রত্যাশা একটাই—বদলির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হোক, ডা. ফারজানা জামান পুণমকে পাকুন্দিয়ায় রেখে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখার সুযোগ দেওয়া হোক।
মানুষের পাশে দাঁড়ানো যদি অপরাধ হয়, তাহলে পাকুন্দিয়ার মানুষ সেই ‘অপরাধী’ চিকিৎসককেই পাশে চায়।


















